বাইডেনের লাল বাতি, পুতিনের বাংকার আর জেলেনস্কির শেষ উপায়

হালকা চালেই বলুন আর গম্ভীরভাবেই বলুন, দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের হুমকিকে পুতিন ধরে বসেছেন। ডেইলি মেইলের খবর: পুতিন সাইবেরিয়ায়, তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী উরাল পর্বতমালার বাংকারে আশ্রয় নিয়েছেন। খবরটা রাশিয়াই ফাঁস হতে দিয়েছে, যাতে ইউরোপ পরিস্থিতির গুরুত্বটা বুঝতে পারে। ২৩ ফেব্রুয়ারি জারি করা পারমাণবিক সতর্কতা এখনো বহাল রেখেছে রাশিয়া। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া তার ব্যালিস্টিক মিসাইল বাহিনীর পূর্ণ মহড়া করেছে। ওয়াশিংটন তা-ও বুঝতে চাইছে না। পুতিন বারবার বলেছেন, অস্তিত্বের হুমকি ঠেকাতে তিনি যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। ইউক্রেনে রাশিয়া সর্বশক্তি নিয়োগ করেনি ওয়াশিংটনকে এটাই বোঝাতে যে ইউক্রেন হলো মহড়া, বড় যুদ্ধ সামনে আছে, যদি ন্যাটো পিছু না হঠে।

তবে বাইডেন মনে হয় সত্যি বলছেন। হেনরি কিসিঞ্জারের জীবনীকার ইতিহাসবিদ নিয়াল ফার্গুসন ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই, গত ২২ ফেব্রুয়ারি ব্লুমবার্গ নিউজে প্রকাশিত লেখায় এক ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার মুখের কথা তুলে দিয়েছেন: একমাত্র শেষ খেলা হলো পুতিন সরকারের পতন। বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে এটা ভাবেনি। রাষ্ট্রীয় নীতি হুটহাট করে তৈরি হয় না আমেরিকায়। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি নুলান্ড মার্কিন কংগ্রেসের কাছে স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছিলেন, রাশিয়ার পালাবদলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। পরের হিসাব আমাদের জানা নেই। তবে হিলারি ক্লিনটনের একটা ফাঁস হওয়া মেইলের কথা বলা যায়। ওবামা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তিনি হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তাকে মেইলে বলেন, ‘তোমাকে আমরা হোয়াইট হাউসে চাই পুতিন-পরবর্তী রাশিয়া বিষয়ে কৌশল প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের জন্য।’

বাইডেন আর পুতিন যখন পরস্পরকে ধ্বংসে নেমেছেন, তখন জেলেনস্কিই পারেন ইউক্রেনকে বাঁচাতে। পারমাণবিক যুদ্ধের কেয়ামত এড়ানোর চাবিটা ইতিহাস তাঁর হাতে তুলে দিয়েছে। ১৯৮৩ সালে কিউবান মিসাইল সংকটে আমেরিকা পারমাণবিক বোমা ছোড়ার হুকুম দিয়েই দিয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত আমেরিকান সেনারা হাত গুটিয়ে নেওয়ায় সে সময় পৃথিবী একচুলের জন্য বেঁচে যায়। ভাগ্য এবারও পৃথিবীকে বাঁচাবে আর বাকিরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, এমনটা নাও হতে পারে।

‘পুতিন-পরবর্তী’ এই খোয়াব থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে ট্রয়ের ঘোড়া বানিয়ে রুশ দুর্গ দখল করতে চেয়েছে। একের পর এক পূর্ব ইউরোপীয় দেশে ‘রঙিন’ বিপ্লব ঘটানো হয়েছে। বাকি ছিল ইউক্রেন, বেলারুশ আর কাজাখস্তান। ইউক্রেনের জন্য পরিকল্পিতভাবে জেলেনস্কি নামক এক সাধারণ ব্যক্তিকে প্রথমে দেশটির জননায়ক বানানো হয়। দেশটির শীর্ষ ধনকুবের জায়নাবাদী কোলোমোয়িস্কির টাকা ও মিডিয়া সাম্রাজ্য জেলেনস্কিকে নির্বাচিত করায় খেটেছে। রুশপন্থী সরকারকে উচ্ছেদের সময় ইসরায়েলের পাঠানো স্বেচ্ছাসেবকেরা তাঁদের হয়ে কাজও করেছেন। জেলেনস্কি অন্য ধনকুবেরদের বেকায়দায় ফেললেও কোলোমোয়িস্কির সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার তছরুপের কিছুই করেননি। উল্টো তিনি হয়ে ওঠেন সরকারের বাইরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং একটি প্রদেশের গভর্নর। ধনকুবের ও রাষ্ট্রনায়কদের অর্থ পাচারের নথিপত্র ফাঁসের জন্য বিখ্যাত প্যান্ডোরা পেপারসে জেলেনস্কি ও তাঁর স্ত্রীর নামও আছে। লন্ডনসহ বিভিন্ন ‘অফশোর’ কোম্পানিতে তাঁদের অগাধ ধনসম্পদের বিবরণ পশ্চিমা গণমাধ্যমে ভালোভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।

এহেন জেলেনস্কি না পারবেন ইউক্রেনের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে, না পারবেন আপস করতে। কারণ, তাঁর নিয়মিত সেনাবাহিনী মোটামুটি বিধ্বস্ত। আবার রাশিয়ার সঙ্গে আপসের হাত বাড়ালেই স্বপক্ষীয় বুলেট তাঁর মাথায় বিঁধতে পারে। ইউক্রেনে যারা লড়ছে, তারা মূলত দেশটিতে ঘাঁটি গেড়ে থাকা উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি। পুতিন তাদের নাৎসিবাদী বলে থাকেন আর আমেরিকার কাছে তারা মুক্তিযোদ্ধা। পরিস্থিতি অনেকটা সোভিয়েত দখলাধীন আফগানিস্তানের মতো। তালেবান ও মোজাহিদরা ছিল তখন আমেরিকার জানপসন্দ ‘হিরো’। কিছুদিন আগেও পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইউক্রেনের আজভ ব্যাটালিয়ন ও রাইট সেক্টরকে নাৎসিবাদ প্রভাবিত বলে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতিতে বদলে গেছে। এখন তারা বাইডেন-কথিত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের বৈশ্বিক লড়াইয়ের মুক্তিযোদ্ধা। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ভাড়াটে যোদ্ধারা ইউক্রেনের হয়ে লড়ছে। মার্কিন ও ব্রিটিশ সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো অনেক আগে থেকেই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। সিরিয়ায় যেভাবে আইএস কাজ করেছে আসাদ সরকারের বিপক্ষে, ইরাকে তারা ছিল ইরানপন্থী সরকারের বিপক্ষে, তেমনি ইউক্রেনে নব্যনাজিবাদীরা পুতিনের বিপক্ষে। ইউক্রেন হয়েছে আমেরিকা আর রাশিয়ার প্রক্সি যুদ্ধের ময়দান।

Comments are closed.