অন্তত ৩৫০ জন সরকারি কর্মকর্তার বিদেশ সফরের সরকারি আদেশ রয়েছে। তাঁদের মে ও জুনে বিদেশ যাওয়ার কথা।
ইউরোপ সফরই বেশি। ইউরোপে যাওয়ার কথা ১৪০ কর্মকর্তার।
অর্থ মন্ত্রণালয় বিদেশ সফর নিষিদ্ধ করার পরও গেছেন কেউ কেউ।
কোনো কোনো সংস্থা সফর বাতিল করেছে।
আরিফুর রহমান
বাংলাদেশ সরকারের লোগো
বাংলাদেশ সরকারের লোগো
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সাইফ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাওয়ার কথা ২৫ মে। সফরসূচি বলছে, দেশ দুটিতে তাঁরা থাকবেন সাত দিন। সফরটি শিক্ষাসফর। ব্যয়ের উৎস ‘খুলনায় কনভেনশন ও প্রদর্শনী সেন্টার’ নামের একটি প্রকল্প, যেটি বাস্তবায়ন করছে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়।
এই শিক্ষাসফরের দলে আরও রয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব দিল আফরোজা, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বিভাগের উপসচিব রফিকুল হক, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী সাবিরুল আলম ও নির্বাহী প্রকৌশলী মর্তুজা আল মামুন এবং খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল হাসান খান।
এই শিক্ষাসফরে দুই দেশ ভ্রমণ করে কর্মকর্তারা কী শিখবেন, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কনভেনশন সেন্টার-বিষয়ক ‘শিক্ষা’র প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি সফরটি অনিশ্চয়তায় পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বন্ধ ঘোষণার পর। গত বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয় এক পরিপত্র জারি করে জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সকল প্রকার বিদেশভ্রমণ বন্ধ থাকবে। এরপর গত সোমবার আরেকটি পরিপত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণও বন্ধের নির্দেশ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
‘বিদেশ যাওয়া নিয়ে আমি বিভ্রান্ত। যেতে পারব কি না, জানি না। তবে পরিপত্রটি আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল।’
আজম ই সাদাতের, রাজশাহী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক
অবশ্য কেউ কেউ এখন আর বিদেশ যেতেই চান না। কারণ, তাঁদের আশঙ্কা, নিরীক্ষাসংক্রান্ত ঝামেলা হতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ (বিএসইসি) কোনো কোনো মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিদেশ সফর স্থগিত করেছে।
পরিপত্র জারির পর কেউ কেউ বিদেশে চলেও গেছেন। এ তালিকায় রয়েছেন শ্রমসচিব এহছানে এলাহী এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদ। তাঁরা একটি শিক্ষাসফরে ছয় দিনের জন্য ডেনমার্ক গেছেন। ১৫ মে থেকে ২১ জুন পর্যন্ত তাঁদের ডেনমার্ক থাকার কথা। সেখান থেকে যাবেন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) একটি কৌশলগত সভায় অংশ নিতে। সেখানে তাঁদের ২৫ মে পর্যন্ত থাকার কথা।
স্পেনে পানি সম্মেলনে যোগ দিতে গত সোমবার রাতে ঢাকা ছেড়েছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সাবেক সচিব
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সাবেক সচিব
হতে পারে পরিপত্রে ইচ্ছে করেই ফাঁকফোকর রাখা হয়েছে। আর সেই সুযোগই কেউ কেউ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পরিপত্রটি এমন হওয়া উচিত ছিল যে সবার বিদেশ সফর বন্ধ থাকবে। একান্ত কারও যেতে হলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সাবেক সচিব
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের পরও জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সফরটি হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সাইফ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘সবুজসংকেত’ ছাড়া তিনি এ সফরে যাবেন না। অবশ্য তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের কয়েকটি বিভ্রান্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পরিপত্রে একবার বলা হয়েছে, বিদেশ ভ্রমণ সীমিতকরণ, আরেক জায়গায় বলা হয়েছে বিদেশ সফর বন্ধ। পরিপত্র জারির আগেই যেসব বিদেশ সফরের সরকারি আদেশ (জিও) জারি হয়েছে, সেসব সফর বন্ধ থাকবে কি না, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণাও নেই।
অর্থ মন্ত্রণালয় বিদেশ সফর বন্ধ ঘোষণার আগে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে জারি করা ৫০টি জিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্তত ৩৫০ জন সরকারি কর্মকর্তার বিদেশভ্রমণের কথা রয়েছে। জিও অনুযায়ী, তাঁরা চলতি মাসে অথবা জুন মাসে বিদেশ যাবেন। কেউ কেউ যাবেন নিজ খরচে স্ত্রী-সন্তানকে সফরসঙ্গী করে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিদেশ ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার পর কর্মকর্তারা এখন পরিপত্রের ফাঁকফোকর খুঁজছেন। তাঁরা বলছেন, পরিপত্র জারির আগে জারি করা জিওর বিপরীতে বিদেশভ্রমণে বাধা নেই। কারও কারও যুক্তি হলো, তাঁরা প্রকল্পের পণ্য সরবরাহকারী, ঠিকাদার, সম্মেলন আয়োজক সংস্থা অথবা উন্নয়ন সহযোগীর টাকায় যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয়ের সংশ্লিষ্টতা নেই।
ইউরোপ সফরই বেশি
যে ৫০টি জিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়ার কথা ১৪০ কর্মকর্তার। অন্তত ৫০ জনের দক্ষিণ কোরিয়ায় ও ২০ জনের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা। সফর তালিকায় রয়েছে কানাডা, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশভ্রমণের উদ্দেশ্য হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে ‘এক্সপোজার ভিজিটের’ কথা বলা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এটি মূলত আনন্দভ্রমণ। বেশ কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাসফরের কথা বলা হয়েছে। সভা, কর্মশালা, সেমিনার, সম্মেলনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া ও প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যেতে চান কেউ কেউ। কেউ আবার যাচ্ছেন প্রকল্পের আওতায় কেনা পণ্য বা সরঞ্জাম ঠিক আছে কি না, তা দেখতে।
যেমন লিফট ও এসকেলেটরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা দেখতে ২০ মে ১০ দিনের জন্য স্পেনে যাওয়ার কথা গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বাহাদুর আলী ও এমদাদুল হকের। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা রাজশাহী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আজম ই সাদাতের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের। আজম ই সাদাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদেশ যাওয়া নিয়ে আমি বিভ্রান্ত। যেতে পারব কি না, জানি না। তবে পরিপত্রটি আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল।’
অর্থ মন্ত্রণালয় ডলারের সংকটের কথা মাথায় রেখে পরিপত্র জারি করে বিদেশ সফর বন্ধ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার খোলাবাজারে ডলারের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যেও কেউ কেউ বিদেশ যাচ্ছেন।
জানতে চাইলে সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, হতে পারে পরিপত্রে ইচ্ছে করেই ফাঁকফোকর রাখা হয়েছে। আর সেই সুযোগই কেউ কেউ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পরিপত্রটি এমন হওয়া উচিত ছিল যে সবার বিদেশ সফর বন্ধ থাকবে। একান্ত কারও যেতে হলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে।